মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

আদিতমারী উপজেলার নামকরণঃ লালমনিরহাট জেলাধীন আদিতমারী উপজেলার নামকরণের সুনির্দিষ্ট কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না । তবে জানা যায় যে, আদিত্য সাহা নামে স্বনাম খ্যাত একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি এই এলাকায় বসবাস করতেন, যিনি সমাজ সেবা কর্মের জন্যও খ্যাত ছিলেন । এই এলাকায় সংঘটিত একটি যুদ্ধে তিনি নিহত হন । তাঁর নামানুসারে এই এলাকার নাম হয় আদিতমারী ।

আদিতমারী উপজেলার ভৌগলিক অবস্থানঃ আদিতমারী উপজেলার আয়তন ১৯৫.০৩ বর্গ কিলোমিটার। উপজেলাটির অবস্থান ২৫৫১/   ও  ২৬০৩উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে  এবং ৮৯১৭/   ও  ৮৯২৮/  পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। এর  উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পশ্চিমে কালীগঞ্জ উপজেলা ও রংপুর জেলার গংগাচড়া উপজেলা, পূর্বে জেলা সদর, দক্ষিণে তিসত্মা নদী ও রংপুর জেলার গংগাচড়া উপজেলা অবস্থিত।

ঐতিহ্যঃদীর্ঘকাল ধরে আদিতমারী উপজেলায় নটকুর বান্নী, গোড়ঘাটের বান্নী, মাষানের মেলা ও দশহরার মেলা এ উপজেলার অন্যতম মেলা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া তিসত্মা নদীতে নৌকা বাইচ খেলা এ উপজেলার অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহ্য।

লোক সাহিত্য ও ভাষাঃ এ অঞ্চলের ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত ‘চর্যাপদ’। এর ভাষা-ভঙ্গি বিশেস্নষণে বলা হয়ে থাকে যে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে গৌড়ীয় অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে বঙ্গ-কামরম্নপী আদি সত্মর হতে। চর্যাপদের ভাষায় অত্র অঞ্চলের ভাষা-ভঙ্গির অনেক নিদর্শন লÿ্য করা যায়। উত্তরবঙ্গের অনেক গবেষক এ ভাষাকে সরাসরি বাংলা ভাষা না বলে ‘কামতাবিহারী ভাষা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ অঞ্চলের লোকসমাজে প্রচলিত ভাষার লক্ষনীয় কিছু বিশেষ দিক নিমেণ প্রদত্ত হলো-

ক্রিয়াপদের আগে ‘না’-এর ব্যবহার। যেমন; না খাঁও(খাইনা), না যাঁও(যাইনা)।

‘র’ বর্ণের স্থলে ‘অ’ বর্ণ ব্যবহারের প্রবণতা। যেমন; অং (রং), অসূণ (রসূণ)।

‘ল’ বর্ণের স্থলে ‘ন’ বর্ণ ব্যবহারের প্রবণতা। যেমন; নাল(লাল), নাউ(লাউ)

স্থানের নামের শেষের বর্ণে ‘’’ থাকলে তা তুলে দিয়ে শব্দের শেষে ‘ত’ বর্ণ যুক্তকরণের প্রবণতা। যেমন; মাঠত(মাঠে), ঘাটত(ঘাটে), হাটত(হাটে)।

সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কতিপয় শব্দের উদাহরণ হচ্ছে-মুঁই(আমি), হামরা(আমরা), তুঁই(তুমি), তোমরাগুলা(তোমরা), অঁয়(সে), ওমরা/ওমরাগুলা(তারা)।

লোক সংস্কৃতিঃলোক সমাজে প্রচলিত ছড়া, ছেলস্নক(ধাঁ দাঁ বা ছিল্কা), প্রবাদ-বচন, মেয়েলি গীত, মন্ত্র লোকসঙ্গীত প্রভৃতি লোক সাহিত্যের মূল্যবান উপাদান। এ গুলোর মধ্য দিয়ে সন্ধান মিলে আবহমানকাল ধরে চলে আসা মানুষের রম্নচি, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কার, রসবোধ, সুখ-দুঃখ, উপদেশ, নিষেধ ইত্যাদির। নিমেণ এ অঞ্চলের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো-

ঘুমপাড়ানী ছড়া

আয় নিন্দো বায় নিন্দো

পাইকোরের পাত

কানকাটা কুকুর আইসে

ঝিৎ করিয়া থাক।

ছেল্লক

হাত আছে পাও নাই,

গলা আছে তলা নাই।

মাইনসক ঘিলি খায়,

কনতো শুনি কাঁয়। উত্তর-জামা

প্রবাদ বচন

কপাল গেইছে পড়িয়া,

দুধ খাবার কিননু গাই,

তাঁয়ও হইল আড়িয়া।

মেয়েলী গীত

বাঁশের মধ্যে বাঁশরী,

জমির মধ্যে হলুদী।

বাঁছার কাঁয় কাঁয় আছে দরদী,

তাঁয় বাটপে হলুদী।

ন্ত্র

শিংগী শিংগী চুচড়া মুড়ি,

কাঁয় দ্যাখে তোর বিষের হাড়ি।

বিষ খায় লাফেয়া,

শিংগী বেড়ায় দাপেয়া।

ঘর পোড়া যায় উয়া ফোটে,

শিংগীর বিষ ভাটি ছোটে।

আদিতমারী উপজেলা সংস্কৃতির এক পীঠস্থান । আদিতমারী উপজেলায় অনুষ্ঠিত নটকুর বান্নী, গোড়াঘাটের বান্নী, মাষাণের মেলা, দশহরার মেলায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করে থাকে। 

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃএ উপজেলায় তিন ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সড়ক, রেল এবং নৌ-যোগাযোগের মধ্যে সড়ক যোগাযোগই প্রধান। যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাঁচা সড়কের পরিমান বেশী। সড়ক যোগাযোগে যানবাহন হিসেবে আগেকার দিনে ব্যবহৃত হতো গরম্নর গাড়ী, মহিষের গাড়ী ও পাল্কী। সময়ের ব্যবধানে এ স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক যানবাহন- সাইকেল, রিক্সা, ভ্যান, টেম্পু, ভটভটি, বাস, মাইক্রোবাস, কার প্রভৃতি। পাল্কীর প্রচলন এখন আর নেই। সড়কগুলোর উন্নয়ন হওয়ার সাথে সাথে যান্ত্রিক যানবাহনের দাপটে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গরম্ন এবং মহিষের গাড়ীর প্রচলন। নৌ-যোগাযোগেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। আগেকার দিনের পাল তোলা নৌকা কদাচিৎ নজরে পরে, ভটভট শব্দে ছুটে চলে স্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকা। রেল যোগাযোগের কয়লার ইঞ্জিনও এখন আর নেই, তদস্থলে যোগ হয়েছে আধুনিক ইঞ্জিন। উপজেলায় পাকা রাসত্মা ৭৮ কি:মি:, আধাপাকা রাসত্মা ৩৪কি:মি:, কাঁচা রাসত্মা ৫৯১ কি:মি:, রেলপথ ২১ কি:মি:, রেল ষ্টেশন ৩ টি এবং নৌ পথ ৬৭ নটিক্যাল মাইল।

ইতিহাসের পাতায় আদিতমারীঃ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী লালমনিরহাট মহকুমার যাত্রা শুরম্ন হয়; যা ছিল বাংলাদেশের ৭১ তম মহকুমা। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরন নীতি অবলম্বনে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রতিটি মহকুমাকে জেলায় এবং থানাকে উপজেলায় রম্নপামত্মরের সিদ্ধামত্ম গৃহীত হয়। সিদ্ধামত্ম অনুযায়ী ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর ০৮ (আট) টি ইউনিয়নকে অমত্মর্ভূক্ত করে আদিতমারী থানা উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পূর্বে যা কালীগঞ্জ থানার অমত্মর্ভূক্ত ছিল। অবশ্য ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল কালীগঞ্জ থানার ৭৫ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে আদিতমারী থানা গঠিত হয়। অবশেষে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রম্নয়ারী লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম এই ০৫(পাঁচ)টি উপজেলা নিয়ে লালমনিরহাট জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

মুক্তিযুদ্ধে আদিতমারীঃ মুক্তিযুদ্ধ চলাকলীন সময়ে ০৪ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে পাকসেনারা আদিতমারী এলাকায় প্রবেশ করে অতর্কিতে বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগসহ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাকবাহিনী অনেক নিরীহ বাঙালীকে ধরে এনে আদিতমারী রেল স্টেশন থেকে সারপুকুর ইউনিয়নের মুশর দৈলজোর(বর্তমান উত্তর কামেত্মশ্বর পাড়া) গ্রামের লালপুলের পাশে নির্মমভাবে হত্যা করে। আদিতমারী এলাকায় এটিই বৃহৎ বধ্যভূমি।

আদিতমারী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা (ইউনিয়নভিত্তিক):

দূর্গাপুর ইউনিয়নে          ৮৩ জন
ভেলাবাড়ী ইউনিয়নে      ৪২ জন
কমলাবাড়ী ইউনিয়নে   ৬০ জন
সারপুকুর ইউনিয়নে ২৩ জন
সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নে ৩৯ জন
ভাদাই ইউনিয়নে     ১৪ জন
পলাশী ইউনিয়নে    ০৫ জন
মহিষখোচা ইউনিয়নে ০৮ জন

 

অর্থনীতি ও বাণিজ্যঃআদিতমারী উপজেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। বেশিরভাগ পরিবারের কৃষি জমি রয়েছে। ধান, পাট, আলু, গম, সরিষা শাক-সবজি সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বিক্রয় করে অধিকাংশ পরিবার জীবীকা নির্বাহ করেন। কৃষি পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি অনেক পরিবারের লোকজন মৎস চাষ, পশু-পাখি ও হাঁস-মুরগি পালন সহ নার্সারী স্থাপন করে যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন। অনেকের জীবন চলে এসব কৃষি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে। ÿুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়োজিত রয়েছেন বেশ কিছু লোক। দিন মজুর শ্রেণীর লোক স্বাভাবিক ভাবেই মানবেতর জীবন-যাপন করে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে কাজ না থাকায় তাদের অবস্থা আরও করম্নণ পর্যায়ে পৌছায় এসময় কাজের সন্ধানে অনেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যান। এখানকার বাড়ীঘরের অধিকাংশই কাচা। অন্যান্যগুলো পর্যায়ক্রমে - কুঁড়েঘর, আধাপাকা এবং পাকা।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পঃস্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মধ্যে- বাঁশ (ডালি, কুলা, চালুনী, হাত পাখা, চাপাই, ডোল, গরম্ন বা মহিষের গাড়ির ছই, মাছ ধরার বিভিন্ন যন্ত্র, গবাদি পশুর মুখের টোপর প্রভৃতি), কাঠ (পিগে, গছাম উরম্নন-গাইন, ঢেঁকি প্রভৃতি), মৃৎ (মাটির থালা, হাড়িপাতিল, কলস, হিড়া বামটকি, কুয়ার পাঠ, খাদা বা ঠ্যাগারী, পয়সা রাখার ব্যাংক সহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা), বেত (টালা, ডালি, ডোল, চেয়ার, মোড়া প্রভৃতি), পাট (দড়ি বা রশি, ছিকা, নুছনা, ঝুল, গবাদি পশুর মুখের টোপর প্রভৃতি) ঘাঁনি (তেল, খৈল), লৌহ (কাটারী, ছুরি, চাকু, জাঁতি, দা, কাসেত্ম, কুড়াল, কোদাল, খমত্মা, লাঙ্গলের ফাল, বলস্নম, বর্শা, খোঁচা, তীর প্রভৃতি), সেলাই শিল্প (কাথাঁ, নক্রী্ কাঁথা, হাত পাখা প্রভৃতি), অলংকার শিল্প (স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরী গলার হার, হাতের বালা ও চুড়ি, কানের দুল, নাকের ফুল, কোমরের বিছা প্রভৃতি) এবং চুন শিল্পই প্রধান। অতীতে এখানে হাড় ও শিং শিল্প এবং তাঁত শিল্প ছিল, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তা বিলুপ্ত হয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বয়স্ক কারিগররা অনেকেই নিজেদের পূর্বপুরম্নষের পেশা হিসেবে এ পেশা গুলোকে ধরে রেখেছেন। কিন্তু তাদের বর্তমান বংশধররা ব্যবসা-চাকুরী সহ বিভিন্ন পেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নদ-নদীঃ এ উপজেলায় উলেস্নখযোগ্য নদ-নদীর মধ্যে রয়েছে তিসত্মা, ধরলা, রত্নাই প্রভৃতি।

প্রচলিত খেলাঃএ উপজেলায় প্রচলিত লোকখেলার মধ্যে রয়েছে- গোলস্নাছুট, দৌড়াদৌড়ি, হা-ডু-ডু, বুড়ি ছি, বৌ ছি, কানা মাছি, চেংগু পেন্টি, কিতকিত, ছোপাছুটি, ইকরি বিকরি, নাগরদোলা, ওপেন্টি বাইস্কোপ, ইচিং বিচিং, সাত খোলা, মার্বেল, ঘুড়ি উড়ারো, লাটিম ঘুড়ানো, গাড়াগাড়ি, ঠগা খেলা, ব্যাঙ ঝাঁপ, দড়ি খেলা, গুটি খেলা, পাতা ছেড়া খেলা, চড়ুই ভাতি, চকচ্চাল খেলা, ডিগ্গেল খেলা প্রভৃতি ছাড়াও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা। জলক্রীড়ার মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। প্রচলিত আধুনিক খেলার মধ্যে উলেস্নখ যোগ্য হচ্ছে- ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাড মিন্টন, দাবা, লুডু প্রভৃতি।

উলেস্নখযোগ্য দর্শনীয় স্থান বা স্থাপনা ও কর্মকান্ডঃ আদিতমারী উপজেলায় বেশকিছু দর্শণীয় স্থাপনা রয়েছে। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই দর্শণীয় স্থানগুলোতে দর্শনার্থীদের সমাগম হয়। নিমেণ এরকম কিছু দর্শণীয় স্থানের নাম ও অবস্থান উলেস্নখ করা হলো;

হযরত শাহ নেওয়াজ কুদ্রত আলী (রহঃ)-এর মাজারঃ  আদিতমারী উপজেলাধীন সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের খাতাপাড়া মৌজায় লালমনিরহাট-পাটগ্রাম সড়কের দক্ষিণ পাশে এ মাজার অবস্থিত।

জনশ্রম্নতি অনুযায়ী, হযরত শাহ নেওয়াজ কুদ্রত আলী (রহঃ) ঊনবিংশ শতাব্দির আশির দশকে এখানে আগমন করেন এবং খাতাপাড়াস্থ জঙ্গলে (ময়না কাটার আড়া) আবাসস্থল গড়ে তুলেন। বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে স্থানীয় জনৈক শুকুর (শিকার) মামুদ একজন খাদেম হিসেবে তার সান্নিধ্যে ছিলেন। শুকুর মামুদের জীবদ্দশায় তিনি ইমেত্মকাল করলে, তাঁকে এখানে সমাধিত করা হয়। বিংশ শতাব্দির ষাটের দশকে ১১০ বছর বয়সে শুকুর মামুদ ইমেত্মকাল করলে তাকে হযরত শাহ নেওয়াজ কুদ্রত আলী (রহঃ)-এর মাজারের পশ্চিম পাশে সমাহিত করা হয়। হযরত শাহ নেওয়াজ কুদ্রত আলী (রহঃ) সম্পর্কে কথিত আছে যে, তিনি কামেল ওলী হযরত শাহ্ জামাল (রহঃ)-এর অথবা তার কোন সহযাত্রীর দুরতম বংশধর ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি‘কানা পীর’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের ২৭ তারিখে ইছালে সওয়াব উপলক্ষ্য তার মাজার প্রাঙ্গনে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

শঠিবাড়ী পাগলা পীর ও বিবির ধামঃ আদিতমারী উপজেলাধীন দূর্গাপুর ইউনিয়নের উত্তর গোবধা মৌজায় শঠিবাড়ী বাজারে এ ধামদ্বয় অবস্থিত। জনশ্রম্নতি রয়েছে, অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে কোন এক মাজার সাধক এখানে পাগলা পীর ও বিবির ধাম স্থাপন করেন।

ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে পাকিসত্মান আমলের সূচনা হয়। প্রজন্মামত্মরে ধামদ্বয় স্থানীয় লোকজনের নিকট অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। পাকিসত্মান আমলেও এখানে নিয়মিত বাৎসরিক উৎসব পালিত হতো। বাৎসরিক উৎসবের সময় বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক লোকজন আসতেন বলে শোনা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে উভয় ধামে উৎসব পালন বন্ধ ছিল, তবে টুকি-টাকি মানতের কাজ চলতো। ১৪০৯ বঙ্গাব্দে মোঃ শাহাদত আলী নামে জনৈক ভক্ত পাগলা পীরের ধামটি সংস্কার করে আবারও বাৎসরিক উৎসবের প্রচলন শুরু করেন।

স্বর্ণামতি শিবাশ্রম (জগধাম)ঃ আদিতমারী উপজেলাধীন ভাদাই ইউনিয়নের  আদিতমারী মৌজায় স্বর্ণামতি সেতুর দক্ষিণ পাশে অনতিদুরে এ মন্দির অবস্থিত।

জনশ্রম্নতি অনুযায়ী, জগদানন্দ নামে জনৈক ব্যক্তি (ভিক্ষুক/সাধু) বাংলা ১৩২২ সালে এখানে একটি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন মন্দিরটি ছিল জীর্ণ খড়ের ঘর বিশিষ্ট। স্থানীয় উদ্যোগে ধীরে ধীরে এর উন্নয়ন ঘটতে থাকে। অবশেষে বাংলা ১৩৫৩ সালে মন্দিরটি পাকা করা হয়।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বঃএই উপজেলায় অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। তার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তামত্ম মধ্যে উলেস্নখ করা হলেঃ

কান্তেশ্বর বর্মণঃকামেত্মশ্বর বর্মণ ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রম্নয়ারী বর্তমান লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলাধীন সারপুকুর ইউনিয়নের মুশর দৈলজোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম-রত্নেশ্বর বর্মণ পঞ্চায়েত এবং মাতার নাম-কুঞ্জমারী বর্মণী। তিনি কাকিনা মহিমারঞ্জন মেমোরিয়াল হাই ইংলিশ স্কুল থেকে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন-গিরিজা শংকর গুপ্ত। অতঃপর কাকিনা রাজার সানুগ্রহে তিনি কোলকাতার সেন্ট পল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বরস্বতী পুজাকে কেন্দ্র করে কলেজ কর্তৃপক্ষর সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটার কারণে ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় তিনি কলকাতায় অতিবাহিত করে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তার গ্রামের বাড়ীতে এসে বসবাস শুরম্ন করেন। শিক্ষানুরাগী কামেত্মশ্বর বর্মণ ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তার শিক্ষাগুরম্ন গিরিজা শংকর-এর নামে আদিতমারীতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই বিদ্যালয়ে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যমত্ম তিনি বিনা বেতনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। আদিতমারী উপজেলার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিক মোঃ মজিবর রহমান তার ছাত্র ছিলেন। দীর্ঘ সময় পরে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে কামেত্মশ্বর বর্মণের ন্যায় তিনিও তার শিক্ষাগুরু কান্তেশ্বর বর্মনের নামে আদিতমারীতে একটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কামেত্মশ্বর বর্মণ ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে পূর্ব পাকিসত্মান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন।

ড. শাফিয়া খাতুনঃ ভাষাসৈনিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংগঠক এবং সাবেক সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ড. শাফিয়া খাতুন বর্তমান লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলাধীন দক্ষিণ বত্রিশ হাজারী (বিন্নাগারী) গ্রামে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারী জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এম.এ ডিগ্রী লাভ করার পর শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইন্সটিটিউট থেকে এম.এড ডিগ্রী এবং ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর কলোর‌্যাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইন্সটিটিউটে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ.এম. এরশাদ তাকে সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ড. শাফিয়া খাতুন ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ১লা ফেব্রম্নয়ারী লালমনিরহাট জেলার শুভ উদ্বোধন করেন। এ মহিয়সী নারী ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রম্নয়ারী ইহলোক ত্যাগ করেন।

মোঃ মজিবুর রহমানঃ জন্ম- ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর। তিনি একজন সমাজ সেবক এবং লালমনিরহাট জেলার রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জাতীয় সংসদের ইতিহাসে একই আসনে সর্বাধিক ০৭(সাত) বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রচেষ্টায় আদিতমারী উপজেলায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আদিতমারী রেল ষ্টেশনের  পাশে তার বাসভবন।  

আদিতমারী থেকে পাশ্ববর্তী জেলা/উপজেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের নাম ও দুরত্বঃ

         জেলা/উপজেলার নাম                                        দুরম্নত্ব

1.     লালমনিরহাট জেলা সদর                                      ১০ কিলোমিটার

2.     কালীগঞ্জ উপজেলা                                              ১৮ কিলোমিটার

3.     হাতীবান্ধা উপজেলা                                             ৪০ কিলোমিটার

4.     পাটগ্রাম উপজেলা                                               ৭২ কিলোমিটার

5.     বুড়িমারী স্থল বন্দর                                            ৮৬ কিলোমিটার

6.     তিনবিঘা করিডোর                                             ৮৪ কিলোমিটার

7.     কুড়িগ্রাম জেলা                                                  ৪০ কিলোমিটার

8.     রংপুর বিভাগ                                                   ৫২ কিলোমিটার

তথ্য সূত্রঃ মোঃ আশরাফুজ্জামান মন্ডল(সবুজ), ২০০৭, লালমনিরহাট জেলার ইতিহাস, হক প্রিন্টিং ওয়ার্কস, রংপুর।

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)